স্বপ্ন পূরণে আর কত অপেক্ষা বিন্নাবাইদ ইউনিয়নবাসীর?

আড়িয়াল খাঁ নদীর কূল ঘেঁষা জনবহুল বিন্নাবাইদ ইউনিয়নটির অধিকাংশ মাটির রাস্তা বেহাল অবস্থা। নদীর পানি যতটানা স্বচ্ছ ঠিক ততটা স্বচ্ছ নেই এখানকার জীবনমানের। অনুন্নত বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যাবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসা। এসব নিয়ে হতাশা আর নিদারুণ চাপা কষ্টে ভুগছেন।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার শেষ সীমানা লাগোয়া পাশ্ববর্তী নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার একটি বৃহৎ জনবহুল ইউনিয়ন এটি।

স্বপ্ন নয়, এলাকার উন্নয়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও দেশ স্বাধীনতার পর থেকে উন্নয়ন বঞ্চিত তারা। যারাই ক্ষমতায় এসেছে শুধু আশ্বাসবাণী শুনালেও বাস্তবে পরিবর্তন হয়নি। ফলে এলাকার কোন উন্নয়ন কাজ তাদের কাছে এখন স্বপ্নের মতোই। সীমাহীন কষ্টে জর্জরিত সমস্যা গুলোর প্রতিকারে দাবি ও অভিযোগ করতে করতে ক্লান্ত তারা।

জানা যায়, ইউনিয়নটির অধিকাংশ রাস্তা কাঁচা। বর্ষার সময়ে এসব কাদামাটির রাস্তা চলাচলের একদম অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলে জুতা খুলে হাঁটু সমান কাদামাটি পার হয়ে যেতে হয়। এসময় যে কোন গাড়ি নিয়ে চলাচল ত অসম্ভব অলৌকিক ব্যাপার! । জরুরি কিছু ছাড়া যাতায়াত করেন না কেউ। এসব রাস্তা দিয়ে যোগের পর যোগ ধরে ‘ নড়ক যন্ত্রণা! ভোগ করে আসছেন বাসিন্দারা।

তবে অবশেষে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন তারা। ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে নরসিংদী জেলা গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়নের বীরকান্দা থেকে ঝালকান্দা হয়ে বালুয়াঘাট পর্যন্ত ৩.২২ কি.মি. সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। মাটি খনন, বালু ভরাট, সাইড ওয়াল নির্মাণ হচ্ছে। এই রাস্তাটি দীর্ঘ দিনের প্রাণের দাবি ছিল। এটি সহ বর্তমানে ৩ টি রাস্তার কাজ চলমান। কিছু কাজ করাও হয়েছে৷

সূত্র জানায়, আরো তিনটি রাস্তার কাজ অচিরেই শুরু হবে। এগুলো হচ্ছে, বীরকান্দা ঈদগাহ থেকে চরছায়েট সুইচ গেইট হয়ে রাধাখালী ৭ নং রোড পর্যন্ত। ৭নং রোড কফিল উদ্দিনের বাড়ি থেকে ঘোশালাকান্দা ঈদগাহ হয়ে দীঘলদী কান্দা স্লুইচ গেইট পর্যন্ত। ৭ নং রোডের গাজীর মোড় থেকে রতন চেয়ারম্যানের বাড়ি রাস্তা। এছাড়াও আরো বেশকিছু রাস্তার টেন্ডার ইতিমধ্যেই হয়ে আছে বলে জানা যায়। এছাড়া বাকি অন্য রাস্তা গুলো কয়েক মাসের মধ্যেই টেন্ডার হবার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারাদেশে রাস্তা পাকাকরণ হলেও অত্র ইউনিয়নেই কাঁচা রাস্তা। ছবি- বার্তা বাজার

শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, এই বিষয় গুলোতে মারাত্মক পিছিয়ে রয়েছে বিন্নাবাইদ ইউনিয়ন। উপজেলার সবচেয়ে জনবহুল ইউনিয়ন এটি। একদিকে চর এলাকা, মাটির দুর্গম নাজুক রাস্তায় যাতায়াত সমস্যা অপরদিকে অধিকাংশ গ্রামের কয়েক কি.মি. এর ভিতর উচ্চ বিদ্যালয় না থাকায় লেখাপড়া বঞ্চিত হচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। যারা লেখাপড়া করে, তাদের এলাকা থেকে ৬-৭ কি.মি. দুরের কোন স্কুলে গিয়ে পড়তে হয়। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাতে অভিভাবকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে নিরক্ষরতার সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

কিছু গ্রামে কয়েক কি.মি. এর মধ্যে প্রাথমিক স্কুলও নেই। উল্লেখযোগ্য কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও নেই। অবকাঠামো গত তেমন কোন উন্নয়ন নেই। সবদিক থেকেই বঞ্চিত তারা। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো যাতায়াত ব্যাবস্থা নেই। এই সময় উপরে তাকিয়ে দোয়া দুরুদ পড়া ছাড়া কিছুই করার থাকেনা। ফলে চিকিৎসা অভাবে জীবন দুর্বিষহ হয়ে ধুঁকতে হয় । বীরকান্দা, ঝালকান্দা, মেরাতলী, কাশিমনগর, চরছায়েট, গোশলাকান্দা, রাধাখালি, জহুরিয়াকান্দা, চর-কাশিমনগর, রাজামপুর, লথিফপুর, এসব গ্রাম গুলোতে রাস্তার সমস্যা। এসব গ্রামের আশপাশের কয়েক কি.মি. নেই কোন কমিউনিটি ক্লিনিক বা অন্য কোন চিকিৎসা ব্যাবস্থা। সমস্যা সমাধানে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ব্যাক্তি উদ্যোগও জরুরী।

কৃষি ও কুটির শিল্প নির্ভর ইউনিয়নটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর সবজি, বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলে। ভালো যোগাযোগ ব্যাবস্থা না থাকায় বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না। ফলে মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে। উপজেলা সদরে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটি রাধাখালী ব্রীজের পরই বেহাল অবস্থা। রাধাখালী থেকে মেরাতলী ব্রীজ পর্যন্ত সড়ক নির্মণ খুবই জরুরী। এদিকে ইউনিয়নের চরছায়েট সুইচ গেইটটি একটি প্রভাবশালী পক্ষ বন্ধ করে রাখায় দীর্ঘ দিন ধরে কয়েক গ্রামের মানুষের শত শত একর জমি, সেচ সংকটে ফসল উৎপাদন করতে পারছেনা বলে অভিযোগ। দ্রুত এটি খুলে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

নির্ভর যোগ্য একটি সূএে জানা যায়, স্থানীয় সংসদ সদস্য শিল্পমন্ত্রী এডভোকেট নুরুল মজিদ হুমায়ুন রাস্তা গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর প্রতিফলন হিসেবেই কয়েকটি রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। বাকি গুলো শুরু হবার পথে রয়েছে। উন্নয়ন বান্ধব এই সংসদ সদস্য এসব সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট আন্তরিক। বাকি অন্য সব সমস্যা গুলো সমাধান করার বিষয় তিনি আন্তরিক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলেও জানা গেছে।

বিন্নাবাইদ ইউনিয়নের বীরকান্দা গ্রামের বাসিন্দা সংস্কৃতি কর্মী কবি দয়াল ফারুক বলেন, ‘শিক্ষা, চিকিৎসা, সংস্কৃতি এসব বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি। শিক্ষার দিক দিয়ে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা পিছিয়ে আছে। আমাদের এখানে একটি উচ্চ বিদ্যালয় জরুরি। রাস্তা গুলোর কাজ যেন টেকসই হয় এটাই আমাদের দাবি।’

 

মাটি ভরাটের কাজ চলমান। ছবি- বার্তা বাজার

সমাজকর্মী রুবেল পারভেজ বলেন, ‘কয়েকটি রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে এটা আনন্দের বিষয়। এটা আমাদের দীর্ঘ দিনের প্রাণের দাবি ছিল। বাকি গুলো দ্রুত হবে বলে আশাবাদী আমরা। স্কুল স্থাপনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। আমরা নিজেরা একটি প্রাথমিক স্কুল স্থাপনের চেষ্টা করছি।’

বিন্নাবাইদ ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা গোলাপ বলেন, ‘জনগনের দাবি ওই আমার দাবি। কয়েকটি রাস্তার কাজ চলমান। বাকি অনেকগুলো টেন্ডার হয়ে আছে। এছাড়াও অন্য গুলো অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে যাবে। দুয়েক মাসের মধ্যেই দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি হবে।’

এলাকাবাসী জানায়, তারা এখন আর আশ্বাস নয়, কাজের মাধ্যমে প্রতিফলন দেখতে চায়।
যে কাজ গুলো শুরু হয়েছে তা ধীরগতিতে চলছে৷ অল্প কিছু কাজ শুরু করে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। যারা কাজের দায়িত্ব পেয়েছে তাদের কাজগুলো যাতে ধারাবাহিক, টেকশই ও স্থায়ী হয় তা যথাযথ তদারকি ও নিশ্চিতের দাবি তাদের ।

এ বিষয়ে বেলাবো উপজেলা (এলজিইডি) প্রকৌশলী শামসুল হক ভুঁইয়া মুঠোফোনে এ প্রতিবেদকে বলেন, ‘ আমি নতুন যোগদান করেছি। আমি রাস্তা গুলো পরিদর্শন করে দেখে এসেছি। অনেক গুলো টেন্ডার হয়ে গেছে। বাকি গুলো তৈরি হয়ে আছে। অল্প কিছুদিনের ভিতর তাও হয়ে যাবে৷ কাজে কোন ধীরগতি হবেনা। কাজ যাতে টেকসই হয়, কোন রকম গাফিলতি না হয় আমি এটা তদারকি করব। এসব কাজ গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।

বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো