সুদের মহাজনের চাপে আদালতে ঘুরছে শতাধিক পরিবার

নাম তার মো. হেলাল হোসেন। বাড়ি সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাগুড়াবিনোদ ইউনিয়নের ঘরগ্রাম পূর্বপাড়া এলাকায়। তিনি করেন সুদের কারবার। তার কাছ থেকে একবার সুদে টাকা নিলে সেই জাল থেকে আর কখনও বের হওয়া যায় না। জীবন যাবে, তবু সুদ-আসল কোনোটাই শোধ হবে না। তিনি যে কোনো ব্যাংকের চেকের পাতা রেখেই দিচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা লোন। বিনিময় নিচ্ছেন তাদের কাছ থেকে সুদ আসলে কয়েকগুণ। আসলেরও কয়েকগুণ বেশি সুদের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার ফাঁদে পা দেয়া শতাধিক পরিবার।

এদিকে সুদের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেই উল্টো মামলার স্বীকার হচ্ছেন ওই সব সাধারণ মানুষ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ হেলাল হোসেন সমবায় অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাংক চেকের পাতায় স্বাক্ষর রেখে চড়া সুদে লাখ লাখ টাকা লোন দিচ্ছেন। সরকার সুদের অংক এক অংকে নামিয়ে আনলেও হেলাল হোসেন তা করেননি। তিনি বরং আসলেরও কয়েকগুণ বেশি সুদ আদায় করছেন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ কেউ সময় মতো সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে আগেই নিয়ে রাখা ফাঁকা ব্যাংক চেকে তিনি তার ইচ্ছে মতো টাকা বসিয়ে নেন। এভাবে তিনি অসংখ্য ব্যবসায়ীকে তার সুদের ব্যবসার ফাঁদে ফেলে নিঃস্ব করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, তারা মুখ বুজে সব কিছু সহ্য করে সুদের টাকা পরিশোধ করলেও রেহাই মিলছে না। কারো কারোর সুদের সুদও দিতে হচ্ছে। আর তার কথার বাইরে গেলেই দিচ্ছে উকিল নোটিশ ও কোটি টাকার মামলা।

সরেজমিনে গেলে জানা যায়, হেলাল হোসেন স্কুল জীবন থেকেই প্রচন্ড ধুরন্ধর প্রকৃতির। বাবা মোজাম্মেল হক পেশায় ছিলেন একজন পুলিশ কনস্টেবল। তিনি গত হয়েছেন অনেক আগেই। রেখে গেছেন তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। হেলাল হোসেন এদের মধ্যে তৃতীয়। বর্তমানে তিনি তাড়াশ উপজেলা বিএনপির প্রস্তাবিত কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক। কলেজ জীবনের শুরুতেই সে বিয়ে করেন সনাতন ধর্মাবলম্বী এক নাবালিকাকে। এনিয়ে মেয়ের বাবা মামলাও দায়ের করেন। পালিয়ে ছিলেন বেশ কয়েক মাস। পরে সামাজিকভাবে মামলার ফয়সালাও হয়। সম্প্রতি স্ত্রী ও তিন কণ্যা সন্তান রেখে পরকিয়া প্রেমের মাধ্যমে বিয়ে করেছেন দুই সন্তানের জননী এক স্কুল শিক্ষিকাকে।

তার বাবা মোজাম্মেল হকের জীবদ্দশায় রেখে যান প্রায় ১০-১২ বিঘা জমি। নানা অপকর্ম করতে গিয়ে প্রায় সবই বিক্রি করে ফেলেন হেলাল হোসেন। সব হারিয়ে অভাবের তাড়নায় নিজ এলাকা তাড়াশে মিলন সিনেমা হলে টিকিট বিক্রেতার চাকরী নেন। এতেও সংসার চালাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয় তাকে। অভাব যেন তাকে তাড়া করে ফিরছিলো। নিরুপায় হয়ে ১৯৯৮ সালে দেশ ছেড়ে চলে যান সৌদি আরবে। সেখানে তিন বছর থেকে দেশে ফেরেন। যে টাকা উপার্জন করেছিলেন তাও শেষ করেন মাদক, জুয়া, নারীসহ নানা অপকর্মের পিছনে। অভাবে পড়ে জড়িয়ে পরেন কষ্টিপাথরের মূর্তি, মাদক ব্যবসাসহ নানাবিধ অবৈধ কর্মকান্ডের সাথে। স্থানীয়দের মতে সেখান থেকেই পেয়ে যান অর্থনৈতিক সফলতার সিঁড়ি। উচ্চাভিলাসী হেলাল হোসেন আরও অর্থবিত্ত অর্জনের সহজ পথ হিসেবে বেছে নেন সুদের কারবার। থাকেন বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে। ব্যবহার করেন এক্সিও টয়োটা প্রাইভেট কার।

তিনি বর্তমানে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা কয়েকশ’ অসহায় পরিবারের মাঝে উচ্চহারে লোন দিয়ে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সুদে লোন দেয়ার সময় নিরুপায় গ্রহীতাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কৌশলে নিয়ে নেন একাধিক স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক। এক সময় লোন গ্রহীতা মূল টাকা ফেরৎ দিলেও তিনি কৌশলে ১-২টি চেক নিজের কাছে রেখে দেন। পরবর্তীতে ওই চেকগুলোতে মোটা অংকের টাকা বসিয়ে মামলা করে অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন। আর এ ধরণের লাগামহীন অপকর্মের ক্ষেত্রে তিনি থানার ওসি, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়দের সাথে বিশেষ সখ্যতা রয়েছে বলে নিজেকে জাহির করে থাকেন।

এভাবে জনমনে আতংক সৃষ্টি করে দাপটের সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন সুদ কারবার। এতে সর্বশান্ত ও জিম্মি হয়ে পড়েছেন সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও পাবনা জেলার অনেক অসহায় মানুষ। এদিকে হেলাল হোসেনের কাছে ভুক্তভোগী অনেকের স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক ও নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্প থাকায় এবং প্রভাবশালী লোকজনের সাথে সখ্যতা থাকায় কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। তবে, হেলাল হোসেনের নানা অপকর্মের প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয়ভাবে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

স্থানীয় খালকুলা বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী মাসুম মাষ্টার অভিযোগ করে জানান, ব্যবসার প্রয়োজনে হেলাল হোসেনের কাছ থেকে পাঁচটি স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক দিয়ে প্রায় তিনবছর আগে মাসিক ৫ শতাংশ হারে সুদে এক লক্ষ টাকা নেন। কিন্তু তিন মাসের সুদ বাকি পড়ায় আমার নামে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ কোর্টে মোট চারটি চেকে ৪৪ লাখ টাকার মামলা করেছেন। ১ লাখ ৬০হাজার টাকা পরিশোধ করার পর মামলাগুলো তুলে নিলেও এখনও তার কাছে একটি স্বাক্ষরযুক্ত সাদা চেক রয়েই গেছে।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার আলীপুর গ্রামের ভুক্তভোগী আকবর হোসেন মুঠোফোনে বলেন, হেলাল হোসেনে আমার নামে সিরাজগঞ্জ কোর্টে ২৫ লাখ টাকার মামলা দায়ের করেছে। মামলাটি এখন রায়ের পর্যায়ে রয়েছে বিধায় কোন উপায় না পেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

তাড়াশের কাওরাইল গ্রামের মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, হেলাল হোসেনর কাছ থেকে তিনটি সাক্ষরযুক্ত সাদা চেক দিয়ে সুদের উপর ৭ লাখ টাকা ঋণ নেই। দীর্ঘদিন নিয়মিত সুদ দিয়ে আসলেও দুই মাস বাকী পরায় ওই তিনটি চেক দিয়ে আমার নামে সিরাজগঞ্জ ও নাটোর কোর্টে ৬০ লাখ টাকার মামলা করেছে।

একই ধরনের অভিযোগ করে তাড়াশের নওগাঁ গ্রামের মো. আব্দুল খালেক বিএসসির তিনি জানান হেলাল হোসেনকে তিনটি সাক্ষরযুক্ত সাদা চেক দিয়ে ৫ লাখ টাকা নিয়েছিলাম। সে আমার নামে সিরাজগঞ্জ কোর্টে ২০ লাখ টাকার মামলা করেছে।

একই উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের চকরসুল্লা গ্রামের মো. মাসুদ রানা অভিযোগ করে বলেন, পারিবারিক প্রয়োজনে এক বছর পূর্বে ১০ লক্ষ টাকা চড়া সুদে লোন নেন তিনি। তার কাছ থেকে চারটি ফাঁকা চেক ও নেয় হেলাল হোসেন। প্রথম কয়েক মাস ঠিক ভাবে সুদ পরিশোধ করি। কিন্তু করোনার কারনে দুয়েক মাস সুদ দিতে না পাড়ায় আমার দেয়া সাদা চেকে ইচ্ছে মতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে মোট ১ কোটি ৯০ লক্ষ ১০ হাজার ৫’শ টাকার মামলা দায়ের করেছে। এমন ভুক্তভোগী পাবনা জেলার চাটমহর উপজেলার সমাজ গ্রামের আবুল হাশেম, তাড়াশ উপজেলার নওগাঁর ইউনয়নের সাকুয়াদিঘী গ্রামের রফিকুল ইসলাম রফিকসহ পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার শতাধিক মানুষ। ভুক্তভোগী মানুষগুলো প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুদ কারবারী হেলাল হোসেনের এমন কর্মকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি এবং দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি কামনা করেছেন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. আতিকুল ইসলাম বুলবুল হেলাল হোসেনের এমন কর্মকান্ড স্বীকার করে বলেন তার বিরুদ্বে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ।

এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ সোনালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল মান্নান বলেন, সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদন না থাকলে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সুদের ব্যবসা করতে পারেন না। হেলাল হোসেন যা করছে তা বেআইনি। তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।

জেলা সমবায় কর্মকর্তা সামিউল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ওই ব্যক্তির সুদ কারবারের বিষয়ে আমাদের কোন অনুমোদন নেই। তবে তিনি যদি এমন সুদ কারবার করে থাকে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

এদিকে অভিযুক্ত মো. হেলাল হোসেন তার সুদ কারবারের কথা স্বীকার করে বলেন, এটা আমার ব্যবসা। আমার টাকা উঠানোর জন্য আমাকে মামলা করতেই হবে।

এম এ মালেক/বার্তা বাজার/অমি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো