শ্মশান ডুবে গেছে পানিতে, নৌকাতেই সৎকার হলো মরদেহ

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের মানুষজনের দুঃখভরা জীবন যেন পিছু ছাড়ছেনা। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধ মানুষের ক্ষেতে ফসল নেই, পুকুরে মাছ নেই, মৎস্যঘের পানির নিচে, বসতঘরে পানি, গবাদিপশুর গোয়ালঘরে পানি, উঠানে পানি, সড়কে পানি, চারিদিকে শুধু পানি আর পানি।

এভাবে কোনো মানুষের বসবাস হতে পারে বলে সভ্য সমাজের মানুষজন মনে করেনা। তবে এখানেই শেষ নয়, পানির মধ্যে জীবনযাপন করতে পারলেও মৃত্যুর পরে এইসব জলাবদ্ধ মানুষের উপায় কি?

মৃতদেহ নিয়ে কি করবে তার আপনজনেরা, কোথায় রাখবে? কোথায় নিয়ে ধর্মীয় সকল কার্যাদি শেষ করবে? কোথায় করবে সৎকার কিংবা কোথায় দিবে তাদের কবর?

এমন নানা প্রশ্ন এখন জলাবদ্ধ মানুষের। কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর? বার্তা বাজার প্রতিনিধির কাছে বিলাপ করছিলেন আর হাউ-মাউ করে কাদঁছিলেন মণিরামপুর উপজেলা হাটগাছা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ও হাটগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মনোজ কান্তি মন্ডল। শুক্রবার ভোর ৪টায় বার্ধক্যজনিত কারণে তার পিতা কালীপদ মন্ডল পরলোক গমন করেন।

তিনি আরও বলছিলেন, বাবা, তোমার ২০বিঘা সম্পত্তি কিন্তু তোমাকে রাখবো এমন উঁচু, শুকনো জায়গা বাড়ির আশে-পাশে কোথাও নেই। তোমাকে রাখতে হচ্ছে নৌকায়। শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলী ও ধর্মীয় সকল কর্মকান্ড পালন করছি তোমার মৃত দেহ নৌকায় রেখে। বাবা তুমি মিথ্যা আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত ছিলে। তোমার জমির জলাবদ্ধতা দূর হবে। তথা ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার সমাধান হবে। কিন্তু বাবা, তুমি তা দেখে যেতে পারলে না। মৃত্যুর পর বাড়ির উঠানে তথা তোমার জমিতে তোমাকে রাখতে পারলাম না, এ জমি আমার কি কাজে লাগবে এভাবে বলতে বলতে কাঁদছিলেন মণিরামপুর উপজেলা হাটগাছা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ও হাটগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি মনোজ কান্তি মন্ডল।

জানা যায়, গতকাল শুক্রবার ভোর ৪টায় বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২বছর। ভবদহ অঞ্চল যেখানে বর্ষা ও শরৎ কালে জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকে। যে কারণে দীর্ঘ ৪-৫ মাস এ অঞ্চলে কোন মুসলমান-হিন্দু মারা গেলে তাকে দাফন ও সৎকার করার মত (শুকনো বা উঁচু) জায়গা পাওয়া যায় না বলে এলাকাবাসি জানায়। স

রেজমিনে গিয়ে মণিরামপুরের কুলটিয়া ইউনিয়নের হাটগাছা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মনোজ কান্তি মন্ডলের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, তার বাড়ির চারিদিকে জল আর জল।

ঘরের বারান্দায় ছুঁই ছুঁই করছে জল। ঘর থেকে বের করে তার বাবার মৃত্যুদেহ রাখার মত কোনো (শুকনা) উচু জায়গা নেই। তাই তার বাবার মৃত দেহ নৌকায় রাখা হয়েছে। এসময় পানিতে দাঁড়িয়ে তার আত্মস্বজন মৃত্যুদেহে পুষ্প অর্পন করছে ও মহিলারা উলুর ধ্বনিসহ যাবতীয় ধর্মীয় কার্যাদি পানিতে দাঁড়িয়ে সম্পন্ন করছেন।

বাড়ি থেকে বাহিরে আসার কোন রাস্তা না থাকায় এরপর এলাকাবাসির সহযোগীতায় ওই মৃত্যুদেহ সৎকারের উদ্দেশ্যে নৌকায় করে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়ির আশ-পাশের কিছু লোকের বাড়ি ঘর ডুবে যাওয়ার কারণে তারা রাস্তায় টং বেঁধে আশ্রয় করছে।

এলাকাবাসি জানায়, তাদের রান্না-বাড়া, খাওয়া-দাওয়াসহ সকল কাজে তাদের দারুন সমস্যা হচ্ছে। এক কথায় দুর্ভোগের অপর নাম ভবদহ অঞ্চলে বসবাস করা। তারা আরও জানায়, এ অঞ্চলে অধিকাংশ ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, শ্মশান, মন্দির জলাবদ্ধ অবস্থায় আছে।

অভয়নগরের বেদভিটা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এখানে মসজিদ, মন্দির ও ঘরবাড়ি জলাবদ্ধ অবস্থায় আছে। এ উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নেও একই অবস্থা।

এব্যাপারে কুলটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখর চন্দ্র রায় বার্তা বাজারকে বলেন, আমডাঙ্গার খাল সংস্কার ও ভবদহে সেচ পাম্প সঠিকভাবে চালাতে পারলে এ অঞ্চল আর জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকবে না।

এ্যান্টনি দাস/বার্তা বাজার/এসজে

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো